অনলাইন ডেস্ক:
ঢাকাবাসীর কাছে এখন আতঙ্কের নাম মশা। সেই কবে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লিখেছিলেন, ‘রেতে মশা দিনে মাছি এই নিয়ে কলকাতায় আছি’। ঢাকাবাসীর অবস্থা এখনো সেই প্রাচীন কলকাতার মতোই আছে।
এক বছর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছিল এ বছর ঢাকায় ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তার ঘটতে পারে। সে কথায় কান দেওয়ার সময় হয়নি ঢাকার দুই মেয়রের। এখন যখন অবস্থা নিতান্তই নাজুক তখন মশা মারতে কামান দেগেও কূল-কিনারা করতে পারছেন না কেউ।
পর্যাপ্ত ওষুধ নেই। বিদেশ থেকে সেই ওষুধ কবে আসবে সে কথাও বলতে পারছে না কেউ। রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী রাখার জায়গা নেই। সারাদেশে ডেঙ্গু আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মশা যে কত শক্তিশালী পতঙ্গ তা ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি আমাদের মেয়ররা।
ইতিহাসেও পাওয়া যায়, মশার শক্তিকে উপেক্ষা করেছিল খোদাদ্রোহী নমরুদ। পরে সেই ক্ষুদ্র মশার কারণেই মৃত্যু ঘটে পরাক্রমশালী নমরুদের। একটি মশা তার নাক দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কে চলে যায়। মস্তিষ্কে ঢুকে মশাটি নমরুদকে সব সময় কামড়াতে থাকে। মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে নমরুদ নিজের মাথায় নিজেই আঘাত করতে থাকে। কিন্তু যতই সে আঘাত করুক, মশা ততই তাকে কামড়াতে থাকে। তখন সে তার একজন সৈনিককে ডেকে তার মাথায় আঘাত করতে বলে। কিন্তু মশার কামড় তাতে কমে না। একসময় নমরুদের মাথায় সৈনিকটি প্রচণ্ডভাবে আঘাত করলে তাতে নমরুদের মাথা ফেটে যায়। নমরুদ তখনই মারা যায়।
খ্রিষ্টের জন্মের ২ হাজার ৭০০ বছর আগে চাইনিজরা এই পতঙ্গকে আলাদা করে চিনতে পেরেছিল। ক্ষুদ্র মশা যে কী ভয়ংকর তা সকলেরই জানা। রক্তপায়ী এ পতঙ্গে বিরক্ত হননি এমন মানুষ আছেন বলে মনে হয় না। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে, মশা ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস, জিকা, মস্তিষ্কপ্রদাহ, ইয়েলো ফিভার, ডেঙ্গু জ্বর এবং পীতজ্বরের মতো রোগের সংক্রামক। মশা যে ম্যালেরিয়ার বাহক আর এই ম্যালেরিয়া রোগ আবিষ্কার করে ১৯০২ সালে স্যার রোনাল্ড রস নোবেল পুরস্কার পেয়ে যান।
কত ইংরেজই তো এসেছে কলকাতায়। রাতের পর রাত মশার অত্যাচারে তারা ছটফট করেছে বিছানায় পড়ে। ইংরেজরা খুব ভয় করে মশাকে। ভারতে ইংরেজ কবিদের অন্যতম বিষয় ছিল মশা। ‘মশা’ নিয়ে কত কবিতা কত গান যে আছে ‘অ্যাংলো ইন্ডিয়ান’ সাহিত্যে তার ইয়ত্তা নেই।
কাকে কামড়ায়: মশা আপনাকে বেশি কামড়ায়? ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল এনটোমলজির প্রফেসর জনাথন ডের মতে, আপনি হয়তো ঐ দুর্ভাগা ২০ শতাংশ মানুষে মধ্যে একজন যারা মশাকে বেশি আকর্ষণ করে থাকে। জনাথন ডের মতে, মশা দৃষ্টিশক্তির ওপর নির্ভর করে আক্রমণ করে, বিশেষ করে বিকালের পর তার দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে আক্রমণ করে। সাধারণত কালো, নেভি ও লাল রং পরলে আপনি সহজেই পরিণত হতে পারেন মশার লক্ষ্যবস্তুতে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের রক্তের গ্রুপ ‘ও’ তাদের ওপর মশার হামলা বেশি হয় ‘এ’র তুলনায়। ‘বি’ রয়েছে মাঝামাঝি অবস্থানে।
মশা সাধারণত ফুল বা অন্যান্য লতাপাতা-জাতীয় আবর্জনা থেকেই চুষে খাদ্য সংগ্রহ করে। তবে পুরুষ মশা রক্ত পান করে না বা প্রাণীকে আক্রমণও করে না। শুধু স্ত্রী মশাকে ডিমের উর্বরতা শক্তি বাড়ানোর জন্য যে কোনোভাবে রক্ত পান করতেই হয়। মশা নোংরা জায়গায় বেশি থাকতে ভালোবাসে। কারণ, সেখানে অ্যামোনিয়া জাতীয় বিষাক্ত পদার্থ বেশি থাকে। মানুষকে স্ত্রী মশারাই আক্রমণ করে এবং সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করে গর্ভবতী নারীদেরকে ।
পৃথিবীতে মশা সাড়ে ৩ হাজার প্রজাতির বেশি: মশা নেমাটোসেরা মাছি বর্গের অন্তর্ভুক্ত। মূলত ক্রেন মাছি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এ পর্যন্ত পৃথিবীতে ৩ হাজার ৫১২ প্রজাতির মশা পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশে রয়েছে ১১৪ প্রজাতির মশা। অ্যানোফিলিস, কিউলেক্স, এডিস, হেমাগোগাস প্রভৃতি মশা হলো রোগ সংক্রমণের চালক হিসেবে কাজ করা মশাদের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য এবং সাধারণভাবে বেশি পরিচিত।
সব মশা মানুষকে কামড়ায় না, বরং স্ত্রী কিউলেক্স ও স্ত্রী অ্যানোফিলিসজাতীয় মশা বেশি কামড়ায় বা রক্ত পান করে। একটি মশার ওজন সাধারণত ২.৫ মিলিগ্রাম। মশা এক থেকে তিন মাইল পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে, যা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২.৫ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে। ওরা প্রতি সেকেন্ডে ২৫০ থেকে ৩০০ বার পর্যন্ত পাখা নাড়াতে পারে। রক্তচোষা স্ত্রীজাতীয় মশারা ১৩৫ থেকে ১৬০ ফুট দূর থেকে বুঝে নিতে পারে কোথায় তার খাবার আছে।
মশার লাইফ সার্কেল হিসেবে প্রাথমিকভাবে চারটি স্তর। ডিম, লার্ভা, পোপা ও অ্যাডাল্ট। মশারা উড়ন্ত অবস্থায় যৌনমিলন করে এবং সেক্সুয়াল ট্রান্সমিশন সময় ১৫ থেকে ১৭ সেকেন্ড। এর তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যে মশা ডিম পাড়ে। স্ত্রী মশা সরাসরি পানিতে ডিম পাড়ে এবং একসঙ্গে ২৫০ থেকে ৩০০ পর্যন্ত ডিম ছাড়ে।
জীবদ্দশায় একটি স্ত্রী মশা ১০ হাজার পর্যন্ত ডিম পাড়ে। স্ত্রী মশার ডিম উৎপাদনের জন্য প্রচুর প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। তাই যত বেশি রক্ত চুষতে পারবে, ততই ডিমের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। একটি পুরুষ মশা গড়ে ১০ থেকে ২০ দিন এবং স্ত্রী মশা ৩ থেকে ১০০ দিন পর্যন্ত বাঁচে।